গতি আছে, কর্মসংস্থান আছে, পরিবেশবান্ধব সম্ভাবনাও আছে—কিন্তু নেই মানসম্মত নকশা, প্রশিক্ষণ ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ। তাই ব্যাটারিচালিত রিকশা কি দেশের জন্য অভিশাপ, নাকি সঠিক পরিকল্পনার অপেক্ষায় থাকা একটি সম্ভাবনাময় গণপরিবহন?
বাংলাদেশের শহর থেকে গ্রাম—
সবখানেই এখন ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। লাখো মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত এবং বিপুলসংখ্যক পরিবারের জীবিকা এই বাহনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—সমস্যা কি রিকশা, নাকি সমস্যাটি আমাদের অব্যবস্থাপনা?
৫০ কিলোমিটার গতি, কিন্তু ব্রেক সাধারণ রিকশার!
অনেক ব্যাটারিচালিত রিকশায় চারটি ১২ ভোল্টের ব্যাটারি, উচ্চক্ষমতার মোটর ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ সংযোজন করা হয়। ফলে গাড়ির ওজন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। চালক ও যাত্রীসহ মোট ওজন কয়েকশ কেজিতে পৌঁছাতে পারে।
অথচ অভিযোগ রয়েছে, অনেক যানেই সেই বাড়তি গতি ও ওজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্রেকিং ব্যবস্থা নেই। সাধারণ সাইকেল বা প্যাডেলচালিত রিকশার উপযোগী যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে উচ্চগতির যান চালানো হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াটাই স্বাভাবিক।
অর্থাৎ প্রশ্নটা শুধু “ব্যাটারিচালিত রিকশা চলবে কি চলবে না”—তা নয়।
প্রশ্ন হলো—
৩০০ কেজির যানকে কেন ৩০ টাকার প্রযুক্তির নিরাপত্তার ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে?
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের বরাত দিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত অটোরিকশা ও অটোভ্যান দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৬০৩ জন নিহত হয়েছেন। সংখ্যাটি ভয়াবহ এবং এটিই প্রমাণ করে—নিরাপত্তা সংস্কার এখন আর বিলাসিতা নয়, জরুরি প্রয়োজন। �
Kalbela
কিন্তু সমাধান কি লাখো মানুষের রুটি-রুজি বন্ধ করে দেওয়া?
দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা নিয়ে নির্ভুল সরকারি তথ্য নেই। বিভিন্ন সংগঠনের হিসাবে সংখ্যাটি প্রায় ৮০ লাখ পর্যন্ত বলা হলেও, নিবন্ধনের বাইরে থাকার কারণে এ সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—এই খাতের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে। �
Ajkerpatrika +1
চালক আছেন, মালিক আছেন, মেকানিক আছেন, গ্যারেজ আছে, ব্যাটারি ব্যবসা আছে, চার্জিং ব্যবস্থা আছে—অর্থাৎ এটি শুধু একটি যানবাহন নয়, একটি বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি।
তাই হঠাৎ করে সব বন্ধ করে দেওয়া মানে শুধু যান কমানো নয়—হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ অচল করা এবং অসংখ্য পরিবারকে অনিশ্চয়তায় ফেলে দেওয়া।
গরিবের বাহন বলে কি নিরাপত্তাহীন থাকবে?
এখানেই সবচেয়ে বড় বৈষম্য।
বড় গাড়ির জন্য আন্তর্জাতিক মানের ব্রেক, এয়ারব্যাগ, সেন্সর ও আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়।
কিন্তু শ্রমজীবী মানুষের বাহনের ক্ষেত্রে যেন একটাই সমাধান—
“বন্ধ করে দাও!”
কেন?
গরিব মানুষ কি নিরাপদ প্রযুক্তির অধিকারী নয়?
একজন রিকশাচালকের জীবন কি একজন ব্যক্তিগত গাড়িচালকের জীবনের চেয়ে কম মূল্যবান?
একজন নিম্নআয়ের যাত্রীর নিরাপদ যাতায়াত কি রাষ্ট্রের দায়িত্বের বাইরে?
গরিবের বাহন বন্ধ করা সহজ, নিরাপদ করা কঠিন—আর আমরা বরাবর সহজ পথটাই বেছে নিই।
বন্ধ নয়, চাই ১০ দফা আধুনিক সংস্কার
ব্যাটারিচালিত রিকশাকে নিরাপদ ও অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর করতে নেওয়া যেতে পারে সমন্বিত পরিকল্পনা—
১. বাধ্যতামূলক নিবন্ধন
প্রতিটি যানকে ইউনিক নম্বর ও ডিজিটাল ডাটাবেজের আওতায় আনতে হবে।
২. চালকের লাইসেন্স ও প্রশিক্ষণ
ন্যূনতম প্রশিক্ষণ, ট্রাফিক আইন ও ব্যবহারিক দক্ষতা যাচাই ছাড়া চালকের অনুমতি দেওয়া যাবে না।
৩. মানসম্মত ব্রেক বাধ্যতামূলক
গতি ও ওজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হাইড্রোলিক বা উন্নত ব্রেকিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
৪. কারখানাভিত্তিক স্ট্যান্ডার্ড ডিজাইন
যে কেউ ইচ্ছামতো মোটর, ব্যাটারি ও কাঠামো জোড়া দিয়ে রাস্তায় নামাতে পারবে না।
৫. গতি নিয়ন্ত্রণ
এলাকাভেদে সর্বোচ্চ গতি নির্ধারণ এবং স্পিড গভর্নর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
৬. নির্দিষ্ট রুট
জাতীয় মহাসড়ক নয়—স্থানীয় ও শহুরে উপযোগী রুট নির্ধারণ করতে হবে।
৭. নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা
ব্রেক, ব্যাটারি, চাকা, স্টিয়ারিং ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা পর্যায়ক্রমে পরীক্ষা করতে হবে।
৮. চার্জিং স্টেশন নিয়ন্ত্রণ
অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ সংযোগ বন্ধ করে নিরাপদ চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
৯. নবায়নযোগ্য জ্বালানি
সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য শক্তিনির্ভর চার্জিং ব্যবস্থার সম্ভাবনা বাড়াতে হবে।
১০. সরকারকে রাজস্বের আওতায় আনা
নিবন্ধন, লাইসেন্স ও নির্ধারিত ফি চালুর মাধ্যমে এই বিশাল খাতকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির অংশ করা সম্ভব।
সরকার ইতোমধ্যে ব্যাটারিচালিত রিকশাকে নিবন্ধন, লাইসেন্স, ফিটনেস, চার্জিং স্টেশন ও গ্যারেজ ব্যবস্থাপনাসহ একটি নীতিমালার আওতায় আনার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। সাম্প্রতিক আলোচনায় নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের বিষয়টিও উঠে এসেছে। �
The Daily Star +2
ডাম্পিং নয়, আপগ্রেডিং হোক
আজ যে গাড়িগুলোকে “অবৈধ” বলে রাস্তা থেকে সরানোর কথা বলা হচ্ছে, সেগুলোর বড় অংশই সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থে কেনা।
তাই প্রশ্ন হলো—
একদিনে লাখ লাখ যান বাতিল করলে সেই সম্পদের দায় কে নেবে?
পুরোনো প্রযুক্তিকে একদিনে ডাম্পিং না করে ধাপে ধাপে রেট্রোফিটিং ও আপগ্রেডিং করা যায়।
পুরোনো ব্রেক বদলে উন্নত ব্রেক, অনিরাপদ ব্যাটারি বদলে মানসম্মত ব্যাটারি, অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণে স্পিড গভর্নর, ডিজিটাল নিবন্ধন ও প্রশিক্ষিত চালক—এসবের মাধ্যমে একই বাহনকে অনেক বেশি নিরাপদ করা সম্ভব।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সমস্যা বাহনে, নাকি ব্যবস্থাপনায়?
লাইসেন্স ছাড়া চালক বিপজ্জনক।
ফিটনেস ছাড়া গাড়ি বিপজ্জনক।
প্রশিক্ষণ ছাড়া যে কোনো যান বিপজ্জনক।
আইন প্রয়োগে দুর্বলতা বিপজ্জনক।
তাহলে শুধু রিকশাকে দোষ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে?
বাস দুর্ঘটনা হলে কি বাস বন্ধ হয়?
ট্রাক দুর্ঘটনা হলে কি ট্রাক নিষিদ্ধ হয়?
প্রাইভেটকার দুর্ঘটনা হলে কি ব্যক্তিগত গাড়ি বন্ধ হয়?
না।
তাহলে ব্যাটারিচালিত রিকশার ক্ষেত্রে কেন প্রথম সমাধান হয়—“বন্ধ করো”?
রাষ্ট্রের দায়িত্ব: গরিবের বাহনকে নিরাপদ করা
বাংলাদেশে পরিবহন সংকট বাস্তব। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য সাশ্রয়ী যাতায়াতও বাস্তব প্রয়োজন।
ব্যাটারিচালিত রিকশা হয়তো বর্তমান অবস্থায় নিখুঁত নয়। নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে—এটাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
কিন্তু সমাধান হতে হবে বিজ্ঞানভিত্তিক।
নিষেধাজ্ঞাভিত্তিক নয়, নীতিভিত্তিক।
উচ্ছেদ নয়, উন্নয়ন।
দমন নয়, নিয়ন্ত্রণ।
অব্যবস্থাপনা নয়, আধুনিক ব্যবস্থাপনা।
রিকশা বন্ধ করলে গরিব মানুষ কর্মহীন হবে।
অবাধে চলতে দিলে দুর্ঘটনা বাড়বে।
তাই একমাত্র যৌক্তিক পথ—নিরাপদ, নিবন্ধিত ও নিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত পরিবহন ব্যবস্থা।
গরিবের রুটি-রুজি বাঁচুক, যাত্রীর জীবনও বাঁচুক।
রাষ্ট্রের কাছে দাবি একটাই—
“গরিবের বাহন বন্ধ নয়—নিরাপদ করে রাষ্ট্রের মূলধারায় আনুন।”