খুলনা, ২৩ জানুয়ারি ২০২৬:
পানি সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন ও উপকূলীয় প্রতিবেশ রক্ষার বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় খুলনায় আগামীকাল থেকে শুরু হচ্ছে তিন দিনব্যাপী তৃতীয় উপকূলীয় পানি সম্মেলন। নগরীর সিএসএস আভা সেন্টারে আয়োজিত এই সম্মেলনে দেশের ৬০টি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে অংশ নিচ্ছে, যা একে একটি বৃহৎ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় উদ্যোগে রূপ দিয়েছে।
আগামী ২৪ থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে এই সম্মেলন। এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— ‘পানি প্রতিবেশ সুরক্ষাই টেকসই উন্নয়ন’। ২৬ জানুয়ারি ‘খুলনা ঘোষণা’ ঘোষণার মধ্য দিয়ে সম্মেলনের সমাপ্তি ঘটবে।
আয়োজকরা জানান, বিশ্বজুড়ে পানি সংক্রান্ত ঝুঁকি ও সংকট আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে। নিরাপদ পানির অভাব, দূষণ ও অব্যবস্থাপনার কারণে এখনও লক্ষ লক্ষ মানুষ তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম)-এর সমীক্ষা অনুযায়ী, গত এক দশকে বাংলাদেশে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রায় ২৪ মিটার কমে গেছে এবং প্রতিবছর গড়ে ২ থেকে ৩ মিটার করে নিচে নামছে, যা পানি নিরাপত্তা, কৃষি ও জনজীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে পানি সরবরাহ কমে যাওয়ায় জনসংখ্যার ঘনত্ব ও প্রাকৃতিক ঝুঁকির প্রভাবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও গভীর হচ্ছে। এই বাস্তবতায় পানি ন্যায্যতার মাধ্যমে নিরাপদ জীবনের অধিকার নিশ্চিত করা এখন আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
উল্লেখ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা খুলনায় ২০১১ সালে প্রথম পানি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, যার প্রতিপাদ্য ছিল— ‘পানি বাণিজ্যিক পণ্য নয়, অধিকার’। এরপর ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ছিল— ‘উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় পানির ন্যায্যতা’। এর ধারাবাহিকতায় এবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তৃতীয় উপকূলীয় পানি সম্মেলন।
এ বছর সম্মেলনে চারটি মূল থিমের আওতায় আলোচনা হবে— পানি ও জলবায়ু পরিবর্তন, পানি ব্যবস্থাপনায় সুশাসন, পানি বাস্তুতন্ত্র ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি), এবং অভিযোজনমূলক পরিবর্তনশীল শিক্ষণ। এসব থিমের আওতায় জমা পড়া বিপুল সংখ্যক অ্যাবস্ট্রাক্ট থেকে কারিগরি কমিটি ৭১টি অ্যাবস্ট্রাক্ট চূড়ান্তভাবে গ্রহণ করেছে।
সম্মেলনের উদ্বোধনী ও সমাপনী অধিবেশনের পাশাপাশি এসব অ্যাবস্ট্রাক্ট নিয়ে ১৪টি সমান্তরাল টেকনিক্যাল সেশন অনুষ্ঠিত হবে। যেখানে পানি ও জলবায়ু, পানি ব্যবস্থাপনা, পানি প্রতিবেশ এবং মাঠপর্যায়ের অভিযোজনমূলক অভিজ্ঞতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হবে।
সম্মেলনের কী-নোট স্পিকার হিসেবে উপস্থিত থাকবেন দেশের প্রখ্যাত জলবায়ু ও পানি বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত। সম্মেলনে অংশ নেবেন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক, গবেষক, বিশেষজ্ঞ, জনপ্রতিনিধি, সংবাদকর্মী, উন্নয়নকর্মী এবং জলবায়ু পরিবর্তনে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা।
৩য় উপকূলীয় পানি সম্মেলন কমিটির সদস্য সচিব শামীম আরফিন বলেন, দুর্যোগপ্রবণ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিতে বাংলাদেশ বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, সুপেয় পানির সংকট এবং কৃষি-মৎস্যে প্রতিবন্ধকতা ক্রমেই বাড়ছে। এসব সংকট মোকাবিলায় বিজ্ঞানভিত্তিক ও বাস্তবসম্মত নীতি নির্ধারণ জরুরি।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, সম্মেলনের দায়িত্বশীল ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি কার্যকর ও টেকসই পানি-অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠবে এবং ভবিষ্যতে এর ধারাবাহিকতায় বৃহত্তর পরিসরে ‘বাংলাদেশ পানি সম্মেলন’ আয়োজন সম্ভব হবে। একইসঙ্গে ‘খুলনা ঘোষণা’র মাধ্যমে জলবায়ু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা উঠে আসবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।