আবু-হানিফ,বাগেরহাট প্রতিনিধিঃ
বাগেরহাটের চুলকাঠি বাজারের শতবর্ষী দুধের হাট এখনও ধরে রেখেছে ঐতিহ্য,
ভোরের কুয়াশা ভেদ করে যখন প্রথম সূর্যের আলো ছুঁয়ে যায় বাগেরহাটের চুলকাঠী বাজারে, তখনই শুরু হয় শতবর্ষী দুধের হাটের প্রাণচাঞ্চল্য। এর আগেই বিক্রেতারা ড্রামকে ড্রাম দুধ সাজিয়ে অপেক্ষায় থাকে ক্রেতাদের। কেউ হাঁসফাঁস করে ভ্যান টেনে আনছেন দুধভরা কলস, কেউ আবার মোটরসাইকেলে ঝুলিয়ে আনছেন টিনের কৌটা। খুলনা, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, মোংলাসহ নানা জেলা থেকে আসা ক্রেতাদের ভিড়ে মুহূর্তেই জমে ওঠে হাট। কেউ পায়ে হেঁটে,কেউ মোটরসাইকেলে,কেউবা ভ্যানে নানা পাত্রে দুধ নিয়ে আসে বিক্রির জন্য। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায় দুধ। প্রতিদিন বিক্রি হয় সাত থেকে আট হাজার লিটার খাঁটি দুধ—যা এ অঞ্চলের খামারিদের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। এক শতাব্দী পেরিয়ে আজও ঐতিহ্য ধরে রেখেছে এই দুধের হাট।
স্থানীয় হাকিমপুর, রণবিজয়পুর, ভরসাপুর, চুলকাঠি, খানপুর, সোনাতুনিয়া সহ আরও অনেক গ্রাম থেকে শত শত দুগ্ধখামারি দুধ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এখানকার দুধ যায় দেশের বিভিন্ন জেলা–উপজেলায়। কেউ দুধ কিনছেন মিষ্টির দোকানের জন্য,কেউ হোটেলে ব্যবহারের জন্য, আবার কেউ নিজ বাড়ির প্রয়োজনেই কিনছেন।
স্থানীয় নিরঞ্জন বালা (৬৫) বলেন, পাকিস্তান আমল থেকেই এই হাট বসছে। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ দুধ কিনতে আসে। আগে আমিও বিক্রি করতাম,এখন বয়সের কারণে পারি না,কিন্তু প্রতিদিনই দেখতে আসি হাটে।
রণবিজয়পুর গ্রামের দুধ বিক্রেতা মো.এরফান মোড়ল বলেন, আমাদের নিজেদের গরু থেকে সংগৃহীত দুধ বিক্রি করি এখানে। এই দুধের টাকাতেই চলে সংসার। সাধারণত ৫০–৬০ টাকায় বিক্রি হয় কেজিপ্রতি, তবে ভালো মৌসুমে ৬০–৭০ টাকা পর্যন্ত দাম ওঠে।
খানপুর গ্রামের তৈয়ব মিত্র বলেন, দুটি গাভি থেকে প্রতিদিন ২৫ কেজি দুধ বিক্রি করি এই হাটে। দাম কমে যাওয়ায় গরুর খাবার আর সংসার চালাতে কষ্ট হয়,তবু এই দুধ বিক্রিই আমাদের একমাত্র ভরসা।
খুলনার বড় বাজার থেকে দুধ কিনতে আসা রমজান গোলদার বলেন,খাঁটি দুধ পাওয়া যায় এই হাটে, তাই পাঁচ বছর ধরে এখান থেকে দুধ কিনি।দামও তুলনামূলক কম। তবে মহাসড়কের পাশে হওয়ায় দুর্ঘটনার ভয় থেকেই যায়।
চুলকাঠী বাজার কমিটির সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস শেক বলেন,আমার দাদুর মুখে শুনেছি,দাদুও ছোটবেলা থেকেই এই দুধের হাট দেখে আসছে। অর্থাৎ শত বছরেরও পুরোনো এই হাট এখনো টিকে আছে। প্রতিদিন প্রায় সাত থেকে আট হাজার লিটার দুধ বিক্রি হয় এই হাটে। এখানে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী নেই,তাই দামের তারতম্যও হয় না।
চুলকাঠী বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক মল্লিক আমিনুল কবির মুক্ত বলেন, এই হাট শুধু ব্যবসার জায়গা নয়, এটি আমাদের এলাকার ঐতিহ্য ও মানুষের জীবন জীবিকার প্রতীক। স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে দুধের হাট। প্রতিদিন শত শত খামারি এখানে দুধ বিক্রি করেন। আমরা ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ে নিরাপত্তায় সার্বক্ষণিক নজর রাখছি।
বাগেরহাট জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছাহেব আলী বলেন, চুলকাঠী দুধের হাট বহুদিন ধরে স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।এখানকার দুধের মান ভালো ও ভেজালমুক্ত থাকে।আমরা নিয়মিতভাবে খামারিদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি যাতে তারা আরও মানসম্মত দুধ উৎপাদন করতে পারেন। ভবিষ্যতে এই হাটকে মাননিয়ন্ত্রিত ও আধুনিকীকরণ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সদর উপজেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর বিভাষ চন্দ্র রায় বলেন, মহাসড়কের পাশে হাট বসায় ধুলাবালি ও যানবাহনের ধোঁয়ায় দুধের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আমরা চাই, প্রশাসন ও বাজার কমিটি মিলে এটি একটু ভেতরের খোলা স্থানে সরিয়ে নিতে। পাশাপাশি দুধ সংরক্ষণ ও পরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে খামারিদের সচেতন করা হচ্ছে।